1. m.a.roufekhc1@gmail.com : alokitokha :
খাগড়াছড়ির উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণে মন্ত্রিপরিষদে প্রতিনিধিত্ব কেন জরুরি - আলোকিত খাগড়াছড়ি

খাগড়াছড়ির উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণে মন্ত্রিপরিষদে প্রতিনিধিত্ব কেন জরুরি

  • প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১১৭৬ বার পড়া হয়েছে
মো. আবদুর রউফ:
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি বাংলাদেশের ভৌগোলিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি স্বতন্ত্র অঞ্চল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পর্যটন সম্ভাবনা ও কৌশলগত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও অবকাঠামো, উচ্চশিক্ষা, শিল্পায়ন ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে জেলাটি দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব- বিশেষত মন্ত্রিপরিষদে একজন সরাসরি প্রতিনিধি জরুরি হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব পাওয়ার দাবীদার খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূইয়া।
খাগড়াছড়িতে এখনো বড় শিল্পকারখানা নেই, নেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ। জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য রোগীদের চট্টগ্রাম বা ঢাকায় যেতে হয়। অনুন্নত পাহাড়ি সড়কব্যবস্থার সাথে অনেক দুর্গম এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা নাজুক। ডিজিটাল সংযোগ ও বিনিয়োগ পরিবেশও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি।
অন্যদিকে দেশের সমতল ও শিল্পসমৃদ্ধ জেলাগুলোতে অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি। ফলে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হয়। উন্নয়ন প্রকল্প থাকলেও তা অনেক সময় স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়- এমন অভিযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রিপরিষদ নীতিনির্ধারণ ও বাজেট বণ্টনের অন্যতম কেন্দ্র। কোনো জেলার প্রতিনিধি যদি সরাসরি মন্ত্রিপরিষদে থাকেন, তবে সেই এলাকার সমস্যা, সম্ভাবনা ও বিশেষ চাহিদা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অধিক গুরুত্ব পেতে পারে।
খাগড়াছড়ির মতো ভৌগোলিকভাবে সংবেদনশীল ও সামাজিকভাবে বৈচিত্র্যময় অঞ্চলের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাস্তবতা বোঝেন- এমন একজন প্রতিনিধির উপস্থিতি উন্নয়ন পরিকল্পনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পাহাড়ি কৃষি, ইকো-ট্যুরিজম, সীমান্ত বাণিজ্য ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষা-সংস্কৃতি সংরক্ষণ- এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে অঞ্চলভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি।
খাগড়াছড়ির রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দুই প্রধান দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রভাবিত। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে উন্নয়ন ইস্যু অনেক সময় দলীয় অবস্থানের আড়ালে পড়ে যায়। এই বাস্তবতায় মন্ত্রিপরিষদে একজন প্রতিনিধি থাকা মানে কেবল রাজনৈতিক স্বীকৃতি নয়; বরং উন্নয়ন-অগ্রাধিকার নির্ধারণে জেলার কণ্ঠস্বরকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। এতে প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়তে পারে এবং দীর্ঘসূত্রিতা কমতে পারে। এক্ষেত্রে ওয়াদুদ ভূইয়ার বিকল্প নেই।
পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন কৌশল সমতলের জেলাগুলোর মতো হতে পারে না। এখানে ভূমির ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ, জাতিগত সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা সবই বিবেচনায় নিতে হয়। তাই কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নীতি প্রণয়নের সময় যদি খাগড়াছড়ির একজন প্রতিনিধি সরাসরি মতামত দিতে পারেন, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বাস্তবসম্মততা বাড়বে। যেমন- পাহাড়ি সড়ক নির্মাণে পরিবেশগত ঝুঁকি, পর্যটন উন্নয়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এসব বিষয়ে স্থানীয় অভিজ্ঞতা অপরিহার্য।
খাগড়াছড়িতে কৃষি, ফলচাষ, বাঁশ ও বনজ সম্পদ, এবং পর্যটন খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগ কাঠামো ও প্রণোদনা নীতিতে অঞ্চলভিত্তিক বিশেষ সুবিধা না থাকলে এসব সম্ভাবনা পূর্ণতা পায় না। মন্ত্রিপরিষদে প্রতিনিধিত্ব থাকলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প বা পর্যটন অবকাঠামোর মতো প্রকল্পে অগ্রাধিকার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এছাড়া সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নীতিতেও বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, যা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা সহজ হয় যদি সরাসরি প্রতিনিধি থাকেন।
খাগড়াছড়ির উন্নয়ন বৈষম্য একটি বাস্তবতা, যা অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান। এ বৈষম্য কমাতে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর কণ্ঠস্বর থাকা জরুরি। মন্ত্রিপরিষদে একজন প্রতিনিধি থাকলে জেলার বিশেষ সমস্যা ও সম্ভাবনা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সরাসরি প্রতিফলিত হতে পারে।
তবে প্রতিনিধিত্ব যেন প্রতীকী না হয়ে কার্যকর হয়- সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব, অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন কৌশল এবং পার্বত্য অঞ্চলের স্বকীয়তা বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা প্রণয়ন। খাগড়াছড়ির মানুষের প্রত্যাশা কেবল রাজনৈতিক স্বীকৃতি নয়; টেকসই উন্নয়ন, সমতা ও মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণ। জাতীয় অগ্রগতির ধারায় পার্বত্য জনপদকে সমান গুরুত্ব দিতে হলে এখন সময় বাস্তবসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার। এখনই স্বতঃস্ফূর্ত আওয়াজ উঠুক খাগড়াছড়ির সাংসদ ওয়াদুদ ভূইয়াকে মন্ত্রিপরিষদে নেওয়া হোক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ