বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:২৮ পূর্বাহ্ন
সহিদুল আলম স্বপন:
বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথগ্রহণ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বাঁকবদলের ইঙ্গিত বহন করে। এটি কেবল একটি দলের ক্ষমতায় আগমন নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক অচলাবস্থা, প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা ও গণতান্ত্রিক সংকটের পর এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। তবে এই সূচনা যতটা প্রত্যাশার, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। কারণ তারেক রহমান যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছেন, সেটি শুধু শাসক বদলের অপেক্ষায় ছিল না; রাষ্ট্র নিজেই ছিল ভেতর থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত, বিভক্ত ও আস্থাহীন।
দীর্ঘ নির্বাসন, মামলা ও রাজনৈতিক সংঘাতের পর ক্ষমতায় আসা একজন নেতার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হলো অতীতের বোঝা কাঁধে না নিয়ে ভবিষ্যতের পথে হাঁটা। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস যেমন বিতর্কিত, তেমনি তাঁর নেতৃত্ব ঘিরে প্রত্যাশাও ব্যাপক। এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই তাঁকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। প্রশ্ন হলো তিনি কি দলীয় রাজনীতির সীমা ছাড়িয়ে একজন রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন?
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চিত্র তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র কার্যত অনুপস্থিত ছিল। একতরফা নির্বাচন, বিরোধী মত দমন, প্রশাসনের দলীয়করণ এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দিয়েছে। জনগণ শুধু নতুন সরকার নয়, বরং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশা করছে। এই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে ক্ষমতার পালাবদল হলেও রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাবে না।
তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্নগুলোর একটি হলো রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফাঁদ এড়িয়ে যাওয়া। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে তাঁর দল ও সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ ও বঞ্চনার অনুভূতি স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিশোধের রাজনীতি জায়গা পেলে তা নতুন সংকট তৈরি করবে। গণতন্ত্রের পুনর্গঠনের অর্থ কেবল ক্ষমতা বদল নয়; বরং বিরোধী মত, সমালোচনা ও ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য নিরাপদ পরিসর নিশ্চিত করা। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা ছাড়া এই পুনর্গঠন সম্ভব নয়।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও তারেক রহমানের সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন বাস্তবতা। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট, ব্যাংক খাতের অনিয়ম ও খেলাপি ঋণ অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার দীর্ঘ সময় অর্থনীতির ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তা রাতারাতি দূর হওয়ার নয়। এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আস্থা ফিরিয়ে আনা। বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা দেখতে চায়। হঠাৎ সিদ্ধান্ত, প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ কিংবা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অদূরদর্শিতা সংকট আরও গভীর করতে পারে।
অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের পাশাপাশি দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতি তারেক রহমানের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র। বাংলাদেশ এখন আর কেবল ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ কোনো রাষ্ট্র নয়; এটি আঞ্চলিক রাজনীতিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এখানে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও জটিল। সীমান্ত, পানিবণ্টন, বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব সব মিলিয়ে এই সম্পর্ক বহুস্তরীয়। আবেগনির্ভর বা প্রতিক্রিয়াশীল কূটনীতি এখানে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। প্রয়োজন হবে বাস্তববাদী, স্বার্থভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি।
চীনের সঙ্গে সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগে চীনের ভূমিকা বাংলাদেশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তবে একই সঙ্গে ঋণনির্ভরতার ঝুঁকিও বাস্তব। তারেক রহমানকে তাই একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর না করে বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সংযোগ বাড়াতে পারলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে নতুন সম্ভাবনার পথে এগোতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকট তারেক রহমানের সরকারের জন্য একটি বড় নৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা ঝুলে আছে, আন্তর্জাতিক আগ্রহ কমেছে, আর রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। এই সংকটের সমাধান কেবল মানবিক প্রশ্ন নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। এখানে প্রয়োজন ধারাবাহিক, বহুপাক্ষিক ও কৌশলগত কূটনীতি। আবেগী বক্তব্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক চাপ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমেই এই সংকটের টেকসই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও তারেক রহমানের সামনে সুযোগ ও ঝুঁকি পাশাপাশি অবস্থান করছে। পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রশ্নে পর্যবেক্ষণ করছে। যদি তাঁর সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন গণমাধ্যম ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে না। বরং গণতান্ত্রিক বৈধতা নতুন বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে বিশ্ব রাজনীতি এখন অস্থির। যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথ হবে বহুপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং জলবায়ু কূটনীতিকে জাতীয় স্বার্থের কেন্দ্রে নিয়ে আসা। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের নয়, বর্তমানের বাস্তবতা। এই ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে নৈতিক নেতৃত্বের জায়গায় নিতে পারে।
সবশেষে প্রশ্নটি ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তারেক রহমান কি অতীতের রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিহিংসার রাজনীতি ছাড়িয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের পথে এগোতে পারবেন? ক্ষমতায় বসে সংযম দেখানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, প্রতিশোধ দিয়ে ক্ষমতা দখল করা যায়, কিন্তু রাষ্ট্র টেকসই হয় না। টেকসই হয় কেবল ন্যায়বিচার, সহনশীলতা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড়িয়ে।
বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ তাই কোনো সমাপ্তি নয়; এটি এক কঠিন যাত্রার সূচনা। এই যাত্রায় তিনি যদি দলীয় রাজনীতির সীমা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রনায়কের দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেন, তবে এই সময়কাল কেবল ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের অধ্যায় হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: shahidul.alam@bluewin.ch
সূত্র: মানবজমিন