1. m.a.roufekhc1@gmail.com : alokitokha :
সাংবাদিক আবদুর রউফ এর অনুসন্ধানী রিপোর্ট ও জেলা প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপে যেভাবে শৃঙ্খলা ফিরছে খাগড়াছড়ির গুচ্ছগ্রামে - আলোকিত খাগড়াছড়ি

সাংবাদিক আবদুর রউফ এর অনুসন্ধানী রিপোর্ট ও জেলা প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপে যেভাবে শৃঙ্খলা ফিরছে খাগড়াছড়ির গুচ্ছগ্রামে

  • প্রকাশিতঃ শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬
  • ১০৪২ বার পড়া হয়েছে
আলমগীর হোসেন, খাগড়াছড়ি:
দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে চলে আসা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ভয়ভীতির সংস্কৃতি ভেঙে খাগড়াছড়ির গুচ্ছগ্রামগুলোর রেশন ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। মানবজমিন পত্রিকার খাগড়াছড়ি জেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক আবদুর রউফ এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপের সমন্বয়ে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
খাগড়াছড়ি জেলায় ৮১টি গুচ্ছগ্রামে প্রায় ২৬ হাজার ২০০ রেশন কার্ডধারী পরিবার রয়েছে, যাদের জীবিকা অনেকাংশেই নির্ভর করে সরকারি খাদ্য সহায়তার ওপর। একসময় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রতি কার্ডে নিয়মিত ৮৫ কেজি উন্নতমানের সিদ্ধ চাল বিতরণ করা হলেও ২০০৯ সালের পর ধীরে ধীরে এ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়। এরপর থেকেই শুরু হয় বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম।
অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সিদ্ধ চালের পরিবর্তে নিম্নমানের আতপ চাল সরবরাহ, ওজনে কম দেওয়া, চালের পরিবর্তে গম বিতরণ এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের বঞ্চিত করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সুবিধা বণ্টন দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে অনেক ভুক্তভোগীকে হুমকি ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছে বলেও জানা যায়। অনেককে শারিরীক ভাবে করা হয়েছে লাঞ্চিত। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় গণমাধ্যমকর্মীরা সংবাদ প্রকাশ করলেও অজ্ঞাত কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরও বন্ধ হয়নি এ অনিয়ম। বরং তা চলতে থাকে পূর্বের ধারায়।
এ প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের ১২ই মার্চ সকল হুমকি ধমকি উপেক্ষা করে সাহসিকতার সাথে সাংবাদিক আবদুর রউফ দৈনিক মানবজমিন ও বিডি২৪লাইভ এ “খাগড়াছড়িতে গুচ্ছগ্রামে রেশন বিতরণে অনিয়ম, খাদ্য নিরাপত্তায় সংকট” শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। যেখানে রেশন বিতরণ ব্যবস্থার অনিয়ম, তদারকির দুর্বলতা এবং প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো উঠে আসে। প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ত প্রশাসনের নজরে এলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশের একদিন পর খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত এর নির্দেশনায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হাসান মারুফ’কে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় এ তদন্ত কমিটি। পরে তদন্ত কমিটির আহ্বায়কের নেতৃত্বে এ কমিটি দীঘিনালা, পানছড়িসহ বিভিন্ন উপজেলায় সরেজমিনে তদন্ত চালায়। তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রেশন বিতরণে শৃঙ্খলা আনতে কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়।
বর্তমানে এর ইতিবাচক প্রভাব মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান। যেখানে আগে নিম্নমানের চাল বিতরণ করা হতো, সেখানে এখন উন্নতমানের সিদ্ধ চাল সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অনেক রেশনকার্ড হোল্ডাররা। বিতরণ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে গম। একই সঙ্গে ওজনেও আগের চেয়ে অনেকটা স্বচ্ছতা এসেছে বলে জানিয়েছেন কার্ডহোল্ডাররা। ফলে উপকারভোগীদের মধ্যে আস্থা ফিরতে শুরু করেছে।
তবে এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রেশন কার্ড এখনও অসাধু চাউল ব্যবসায়ীদের নিকট বন্ধক রাখা রয়েছে, যা অনিয়মের একটি বড় উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কার্ড দ্রুত অবমুক্ত করা গেলে পুরো ব্যবস্থায় আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক মো. আবদুর রউফ বলেন, ‘গুচ্ছগ্রামের অসহায় মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই ছিল আমার এই অনুসন্ধানের মূল উদ্দেশ্য। দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলো সামনে আনা ছিল একটি দায়িত্ববোধ থেকে করা কাজ। আমি বিশ্বাস করি, গণমাধ্যম সত্য তুলে ধরলে প্রশাসন সঠিকভাবে এগিয়ে আসে- খাগড়াছড়ির ক্ষেত্রে সেটিই প্রমাণ হয়েছে। তবে এই পরিবর্তন যেন স্থায়ী হয়, সে জন্য নিয়মিত নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।’
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘দৈনিক মানবজমিনে প্রকাশিত সাংবাদিক আবদুর রউফের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে গুচ্ছগ্রামের রেশন বিতরণের অনিয়ম আমাদের নজরে আসে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে রেশন বিতরণে স্বচ্ছতা ও মান নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অবশিষ্ট সমস্যাগুলো সমাধানে আমাদের মনিটরিং কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করে, গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী ভূমিকা এবং প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের সমন্বয়ে এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। তারা বলেন, এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে নিয়মিত তদারকি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ