মো. শাকিল, দীঘিনালা:
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা বিদ্যুৎ অফিসে আগে টাকা পরে কাজ- এ যেন ঘুষ বাণিজ্যের ওপেন সিন্ডিকেট। এখানে বিদ্যুতের সরকারি ফি জমা দিলেও টাকা ছাড়া কিছুই হচ্ছে না। এতে গ্রাহক হয়রানি চরম আকার ধারণ করেছে। এছাড়াও সরকারি কাজকে টাকার বিনিময়ে কাজ বলে দালাল সিন্ডিকেটের সাথে আঁতাত করে বিদ্যুৎ অফিস হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা।
উপজেলার কবাখালী ইউনিয়নের মুসলিম পাড়া ও পূর্ব হাচিনসন পুর এলাকায় দুই তারের বৈদ্যুতিক খুটিকে চার তারে উন্নীত করার কাজ শুরু করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। সরকারি এই কাজটিকে খাগড়াছড়ি বিদ্যুৎ বিভাগ দীঘিনালা বিদ্যুৎ বিভাগের মাধ্যমে পরিচালনা করছে। মুসলিম পাড়ায় টাকা ছাড়া কাজ শেষ করা হলেও পূর্ব হাচিনসন পুর এলাকায় মিটার প্রতি নেওয়া হয়েছে ১ হাজার করে টাকা। এই টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকারও করেছেন টাকা উত্তোলনকারী মো. ইউনুছ ও দীঘিনালা বিদ্যুৎ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী আরিফ।
পূর্ব হাচিনসন পুর এলাকার বাসিন্দারা বলেন, ‘দুই তারকে চার তার করা হবে, চার তার হলে ভলটেজ বাড়বে। এজন্য মালামাল কিনতে টাকা লাগবে। এসব বলে মিটিং করে আমাদের কাছ থেকে মিটার প্রতি এক হাজার টাকা করে নিয়েছে ইউনুছ। আমরা তো এতো কিছু বুঝি নাই। কাজটা যে সরকারি তারা আমাদের সেটা বলেনি। আমরা এমনেই অভাবে আছি, টাকাগুলো ফেরত পেলে অনেক উপকার হতো।’ উক্ত এলাকার সাঈদ মেস্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যুতের কাজের জন্য ইউনুছ, আনসার সদস্য নজরুল সহ আরও কয়েকজনে মিলে মিটার প্রতি ১ হাজার করে টাকা তুলেছে। এখানে টাকা ছাড়া বিদ্যুতের কোন কাজ হয়না।’
আনসার সদস্য নজরুল বলেন, ‘সরকারি কাজ সরকারি কাজ এগুলো মুখে মুখেই শোনা যায়। টাকা ছাড়া এ এলাকায় বিদ্যুৎ আসেনি। প্রথমে বিদ্যুৎ অফিসকে টাকা দিয়েই এলাকায় বিদ্যুৎ আনতে হয়েছিল। এখন দুই তারকে চার তার করলে যদি ভলটেজ বাড়ে তাহলে টাকা দিতে সমস্যা কি?
টাকা উত্তোলনকারী মো. ইউনুছ বলেন, ‘টাকা ছাড়া কোন কাজ হয়না। আর টাকা নেওয়ার বিষয়টি দীঘিনালা বিদ্যুৎ বিভাগের আর-ই এবং সহকারী প্রকৌশলী আরিফ জানেন। আমি উনাদের টাকা দিয়েছি।’
এ ব্যাপারে দীঘিনালা বিদ্যুৎ অফিসের সহকারী প্রকৌশলী আরিফ বলেন, ‘ পূর্ব হাচিন সন পুর এলাকার দুই তার থেকে চার তার করে দেওয়ার কাজটি সরকারি। ঐ এলাকার ইউনুছ নামে এক লোক মিজান মেস্ত্রীকে সাথে নিয়ে দীর্ঘদিন আমাদের অফিসে এসে কাজটি দ্রুত করে দিতে টাকা অফার করে আমাদের কাজের খরচাদির ব্যয় বহনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নগদ ১২ হাজার টাকা দিয়ে যায়। তখন আর-ই স্যারও অফিসে ছিলেন। পরে শুনেছি যে সে এলাকায় মিটার প্রতি বিদ্যুৎ অফিসের কথা বলে ১ হাজার টাকা করে উত্তোলন করেছে। আমরা বুঝতে পারিনি যে এটা এতো দূর গড়াবে।’
খাগড়াছড়ি বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুগত সরকার বলেন, ‘দীঘিনালার মুসলিম পাড়া এবং পূর্ব হাচিন সন পুর এলাকার কাজগুলো সরকারি কাজ। আমাদের অফিসের মাধ্যমেই তা করা হচ্ছে। কাজ পরিচালনার জন্য দীঘিনালা বিদ্যুৎ বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। দীঘিনালা বিদ্যুৎ অফিস টাকা নিয়ে অন্যায় করেছে। এ বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
এছাড়াও দীঘিনালায় বিদ্যুতের নতুন সংযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক খুঁটি, লাইন অপসারণ, মিটার বিকল, মিটার পরিবর্তন, লোড বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সেবায় গ্রাহক ভোগান্তি চরমে পৌঁছে গেছে। সরকারি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নির্ধারিত ফি জমা দিয়েও ঘুষ না দিলে গ্রাহকদের দিনের পর দিন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। এ যেন বিদ্যুৎ আর ঘুষ এখানে একাকার হয়ে পড়েছে।
এর আগে গত ৮ সেপ্টেম্বর গ্রাহক হয়রানির প্রতিবাদে উপজেলায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে কবাখালী ইউনিয়নের বিদ্যুতের গ্রাহকেরা।
এদিকে কবাখালী ইউনিয়নের মিলন পুর গ্রামে একটি ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ খুঁটি অপসারণের জন্য গ্রামবাসীর পক্ষে যথাযথ নিয়ম মেনে আবেদন করলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না তারা। এছাড়া ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল, মিটার রিডিং না দেখে অতিরিক্ত বিল, গ্রাহকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ এখানে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ চায় বিদ্যুৎ গ্রাহকেরা।