নিজস্ব প্রতিনিধি:
সন্তানের জীবনের কাছে নিজের জীবন কতটা তুচ্ছ হতে পারে, কাপ্তাই হ্রদের শান্ত ও নিঃশব্দ পানির নিচে জমা পড়া এক বাবার নিথর দেহই যেন তার নীরব সাক্ষী। কূলভেজা বাতাসের তোড়ে আর উত্তাল ঢেউয়ের থাবায় নিজের বাঁচার আকুতি ভুলে গিয়ে আট বছরের কচি প্রাণটিকে আলোর দিশা দেখালেন এক বাবা। কিন্তু সন্তানকে নিরাপদে তীরে ফিরিয়ে দিয়ে নিজে চিরতরে হারিয়ে গেলেন হ্রদের গহীন আঁধারে। দীর্ঘ ১৬ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর তল্লাশি শেষে উদ্ধার হলো সেই নিঃস্বার্থ বাবার শেষ চিহ্নটি।
ঘটনাটি রাঙামাটির লংগদু উপজেলার। নিহত সেই বীর বাবার নাম সালাম ওরফে ফালান (২৮)। তিনি উপজেলার গুলশাখালী ইউনিয়নের সোনারগাঁও এলাকার মৃত শাহাবুদ্দীনের সন্তান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে মাইনীমুখ বাজার থেকে পরম মমতায় ছেলেকে সাথে নিয়ে নৌকায় চেপে বসেছিলেন সালাম ওরফে ফালান। গন্তব্য ছিল চেনা ঘর। কিন্তু হ্রদের মাঝপথে পৌঁছাতেই যেন কাল হয়ে দাঁড়াল পথটা। হঠাৎ আকাশ কালো করে আছড়ে পড়ল কালবৈশাখীর মতো আকস্মিক ঝড়। উত্তাল ঢেউয়ের তীব্র তোড়ে মুহূর্তের মধ্যেই উল্টে যায় তাদের কাঠের ছোট্ট নৌকাটি।
চারপাশে অসীম পানি আর মৃত্যুর থাবা। সেই চরম বিপদকালেও নিজের প্রাণের মায়াটুকু এক মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে যায়নি সালামকে। সাঁতরে নিজেকে বাঁচানোর অগণিত সুযোগ থাকলেও তিনি আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন নিজের পরম ধন, আট বছরের অবোধ ছেলেটিকে। এক হাতে তোলপাড় করা পানি সামলে অন্য হাতে সন্তানকে ভাসিয়ে রাখার আকুল যুদ্ধ চালিয়ে যান তিনি। ভাগ্যক্রমে একটি জেলে নৌকা পাশে এলে নিজের শেষ শক্তিটুকু নিংড়ে দিয়ে সন্তানকে অন্য হাতে তুলে দেন।
খোকা রক্ষা পেল, কিন্তু বাবা? জেলেদের নৌকায় সন্তান পা দেওয়ার ঠিক পরমুহূর্তেই হ্রদের অকরুণ এক বিশাল ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সালামকে।
খবর পেয়ে রাঙামাটি থেকে ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ ডুবুরি দল। সারারাত ধরে কাপ্তাই হ্রদের নিস্তব্ধ ও গভীর তলদেশে চলে উদ্ধার কাজ। অবশেষে সোমবার সকাল ৮টার দিকে হ্রদের গহীন থেকে টেনে তোলা হয় সালামের নিথর শরীরটা।
লংগদু ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা হেলাল উদ্দীন জানান, বিরতিহীন উদ্ধার তৎপরতা শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পৃথিবীর সমস্ত বাবা হয়তো এমনই হন- সন্তানকে জীবনের আলোটুকু উপহার দিয়ে নিজে নীরবে আঁধারে হারিয়ে যেতে একটুও দ্বিধা করেন না। সালাম হয়তো আর কোনোদিন বাড়ি ফিরবেন না, ছেলের মাথায় হাত রেখে ভালোবাসার পরশ দেবেন না; কিন্তু কাপ্তাই হ্রদের এই বুকে তিনি রেখে গেলেন এক অসীম পিতৃস্নেহের চিরন্তন ইতিহাস।